শরীরের কোষগুলো যখন অগণিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন সেই রোগাক্রান্ত অবস্থাকে ক্যান্সার বলে। শরীরের যেকোনো অংশেই ক্যান্সার হতে পারে। কোষ/টিস্যু বা শরীরের যেকোন অংশে ক্যান্সার শুরু হয়ে সেই নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বা চারপাশে বা শরীরের দূরবর্তী অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্বজুড়ে যেসব রোগে আক্রান্ত হয়ে সর্বাধিক মানুষ মারা যায় তার মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম প্রধাণ কারণ। এই রোগটি সংক্রামক নয় তবে প্রাণঘাতী। আপনি জেনে খুব অবাক হবেন যে কিভাবে দিনে দিনে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এই সংখ্যাটা খুবই বিপদজনক। খুব সম্ভবত আমাদের জীবনযাত্রা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। মোট ক্যান্সার মৃত্যুর প্রায় ৭০% হয়ে থাকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
ক্যান্সারের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো নির্ভর করে টিউমারের অবস্থান, এর আকার এবং শরীরে ক্যান্সার কতটা বিস্তার লাভ করেছে তার উপর। জ্বর, ক্লান্তি, ওজন হ্রাস পাওয়া এগুলো ক্যান্সারের খুব সাধারণ উপসর্গ। কিন্তু উপসর্গগুলো অন্যান্য কারণ যেমন বিভিন্ন রোগ বা ক্ষতের কারণেও হতে পারে। কেউ যদি এসব উপসর্গে ভুগতে থাকেন এবং অনেকদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও তা নিরাময় না হলে বা অবস্থা আরো বেগতিক হয়ে গেলে কালবিলম্ব না করে একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
ক্যান্সারের লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ-
- অবসন্নতা
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও যখন ক্লান্তি দূর হয় না
- অজ্ঞাত কারণবশত ওজন হ্রাস বা বৃদ্ধি পাওয়া
- দীর্ঘদিন ধরে কাশি বা রক্তমিশ্রিত কফ
- কর্কশ আওয়াজ
- স্তনে পরিবর্তন যেমন আকার আকৃতিতে পরিবর্তন, নিপলে পরিবর্তন বা কষ নিঃসৃত হওয়া, স্তন বা বগলের নীচে পিন্ডের সৃষ্টি; লাল, চাপ ধরে বা আইশাকার ত্বক ও চামড়া পুরু হয়ে যাওয়া
- অজ্ঞাত কারণবশত ব্যথা যা দীর্ঘদিনযাবত পীড়া দেয় বা সময়ের সাথে সাথে তীব্র হতে থাকে
- ফুলে যাওয়া বা পিন্ডের মতো সৃষ্টি
- মুখের ক্ষত
- জ্বর
- রাতে ঘুমের মাঝে বার বার প্রচন্ড রকমের ঘাম
- শ্বাস প্রশ্বাসে কষ্ট
- অজ্ঞাত কারণবশত দেহের যেকোনো অংশ হতে রক্তপাত
- মূত্রাশয়ে পরিবর্তন যেমন প্রস্রাবে রক্তের উপস্থিতি, প্রস্রাবের সময় কষ্ট অনুভব করা এবং জ্বালাপোড়া করা
- মলত্যাগে পরিবর্তন যেমন মলে রক্তের উপস্থিতি, মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন (যেমন কোষ্ঠ্যকাঠিন্য বা ডায়রিয়া)
- খাওয়াদাওয়াতে পরিবর্তন যেমন খাওয়ার পর বুক জ্বালাপোড়া বা বদহজম যা দূর হতে চায় না, গিলতে কষ্ট হওয়া, ক্ষুধাবৃত্তিতে পরিবর্তন (যেমন ক্ষুধামন্দা), বমিবমি ভাব, বমি ও পেটে ব্যথা
- মুখের অভ্যন্তরে কিছু পরিবর্তন যেমন জিহ্বাতে সাদা বা লাল ছোপ ছোপ, ঠোঁট থেকে রক্তপাত ও অসাড়তা
- ত্বকের পরিবর্তন যেমন সৃষ্ট পিন্ড থেকে রক্তপাত, আইশাকার চাপের মতো ত্বক, নতুন তিল বা বিদ্যমান তিলে পরিবর্তন, যে ক্ষত সারে না ও ত্বক হলদেটে হয়ে যাওয়া
- অজ্ঞাত কারণবশত যোনী থেকে রক্তপাত
- রক্তশূন্যতা
- নিউরোলজিক্যাল সমস্যা যেমন দৃষ্টিশক্তিতে পরিবর্তন, মাথাব্যথা, খিঁচুনি এবং শ্রবণশক্তিতে পরিবর্তন
এগুলোই ক্যান্সারের প্রধাণ লক্ষণ এবং উপসর্গ। ব্যক্তিভেদে উপসর্গ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় আবার কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে থাকে।
পঞ্চাশ বা পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ক্যান্সার অধিক হয়ে থাকে। নতুন কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলে বা শরীরে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে বলে মনে হলে আপনাকে অতিসত্ত্বর একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
সবাইকে স্ক্রিনিং টেস্ট (সুস্থ সবল ব্যক্তি যাদের দেহে ক্যান্সারের কোন লক্ষণ নেই তাদের শরীরে ক্যান্সারের উপস্থিতি রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য স্ক্রিনিং টেস্ট করানো হয়। আপনার দেহে ক্যান্সারের কোনো পূর্ব লক্ষণ থাকলে তা প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে) করানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়ে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণ এবং অতিসত্ত্বর চিকিৎসা গ্রহণ করার ফলে অনেকক্ষেত্রে ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব।
