বেশিরভাগ ক্যান্সার রোগীই আক্রান্ত হওয়ার পরে ক্যান্সারজনিত ব্যথার সমস্যায় ভুগতে থাকেন। এই ব্যথা স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। ব্যথার তীব্রতা হালকা, মাঝারি বা অসহনীয় পর্যায়ের হতে পারে। ক্যান্সার পুরোপুরি সেরে যাওয়ার পরেও অনেক রোগীরা এই ব্যথার সমস্যায় ভুগে থাকেন।
ক্যান্সারের কারণে এই ব্যথা হয়ে থাকে। দেহে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত টিউমারগুলো যখন নার্ভ বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গের উপর চাপ সৃষ্টি করে বা হাড়ে ক্যান্সার কোষগুলো ছড়িয়ে পড়ে তখন একজন ক্যান্সার রোগী ব্যথা অনুভব করে থাকেন। কোন জায়গায় টিউমার হয়েছে তার উপর নির্ভর করে ব্যথার তীব্রতা। শরীরের যেকোন অংশে সৃষ্ট একটি বড় আকারের টিউমারের তুলনায় নার্ভের কাছে সৃষ্ট একটি ছোট টিউমার অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। ক্যান্সার চিকিৎসা যেমন কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন বা সার্জারির কারণেও ক্যান্সারজনিত ব্যথা হয়ে থাকে।
ক্যান্সারজনিত ব্যথা সবসময় পুরোপুরি দূর করা যায় না কিন্তু কিছু চিকিৎসা পন্থা এবং নিয়ম মেনে চললে ব্যথা খানিকটা উপশম হয় বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। যদি কোন ক্যান্সারের রোগী ব্যথা অনুভব করে তাহলে অতিসত্বর চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। ব্যথা উপশমের ব্যবস্থা করলে তা একজন ক্যান্সার রোগীর শারীরিক কষ্টকে খানিকটা হলেও লাঘব করবে।
ক্যান্সার রোগীভেদে ব্যথার ভিন্নতা দেখা যায়। যেসকল ক্যান্সার রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয় তাদের নিয়মিত চেকআপ করা হয় এবং প্রতি চার ঘন্টা অন্তর অন্তর ব্যথার ব্যাপারে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যেসকল ক্যান্সার রোগী বাড়িতে অবস্থান করে তাদেরকেও পরামর্শ পরদান করা হয় যে যেকোন মূহুর্তে ব্যথা অনুভব করলে কালবিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা চিকিৎসা সেবাপ্রদানকারী টিমের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
০ থেকে ১০ মাত্রা দাগাংকিত একটি পরিমাপকের সাহায্যে একজন ক্যান্সার রোগীর ব্যথার তীব্রতা পরিমাপ করা হয়। কোন রোগীর ক্ষেত্রের ব্যথার পরিমাপ শূন্য আসে না কখনো। ক্যান্সারজনিত ব্যথা কিভাবে উপশম করা যায় সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক এবার-
সার্জারি বা রেডিয়েশন থেরাপি
ক্যান্সারের অন্যান্য লক্ষণ নিরাময়ের পাশাপাশি ক্যান্সারজনিত ব্যথা কমানোর জন্য সার্জারি ও রেডিয়েশন থেরাপির পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। অ্যাডভান্সড স্টেজের ক্যান্সার রোগী বিশেষত স্পাইনাল কর্ড এবং নার্ভের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে উপশম হয়ে থাকে।
ঔষধ
- মৃদু থেকে মাঝারি ব্যথা
ক্যান্সার রোগীদের হাড় ও পেশির ব্যথা নিরাময়ে নন-ওপিওয়েড ড্রাগস (অ্যাসিটামিনোফেন), নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (অ্যাসপিরিন, ইব্যুপ্রোফেন) প্রদান করা হয়ে থাকে। - মাঝারি থেকে চরম ব্যথা
ওপিওয়েডস ( মরফিন, ফেন্টানিল, কোডেইন, অক্সিকোডোন, হাইড্রোমরফোন, মেথাডোন) এবং নন-ওপিওয়েডস ও ওপিওয়েডসের কম্বিনেশন থেরাপি প্রদান করা হয়। - অসহনীয় ব্যথা
দ্রুত কাজ করে এমন ব্যথানাশক ঔষধ যেমন মুখে সেবনের মরফিন গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করা হয়।
নার্ভ ব্লক
অল্প পরিসরে দেহের নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যথা নিরাময়ের জন্য চিকিৎসকরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। বেশিরভাগক্ষেত্রে নার্ভ বা স্পাইনাল কর্ডে ইনজেকশনের মাধ্যমে ইথাইল অ্যালকোহল এবং ফেনল ব্যবহার করা হয়ে থাকে ফলশ্রুতিতে ব্যথার স্থান হতে ব্রেইনে সিগন্যাল পৌঁছানোর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। একিউট এবং অপারেশন পরবর্তী ক্যান্সারজনিত ব্যথার ক্ষেত্রে এই ইনজেকশন প্রদান করা হয় এবং দীর্ঘসময়যাবত এর প্রভাব থাকে।
এপিডুরাল ও ইন্ট্রাথিক্যাল পাম্প
শরীরের বিস্তর অংশজুড়ে যখন ব্যথার প্রভাব থাকে তখন এই পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করা হয়। চামড়ার নীচে একটি প্যাচ লাগানো হয় এবং এ থেকে ধীরে ধীরে লম্বা সময়জুড়ে ঔষধ নিঃসৃত হয়। জিকোনোটাইড বহুল ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
নিউরোসার্জিক্যাল পদ্ধতি
যখন ড্রাগ থেরাপিতে কার্যত ফল পাওয়া যায় না বা এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াগুলো হানিকর হয়ে থাকে তখন নিউরোসার্জারির পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিকে কর্ডোটমি বলে। এটি স্পাইনাল কর্ডের নার্ভগুলোকে ব্লক করে দেয় ফলে ব্রেইনে ব্যথার অনুভবগুলো আর পৌঁছতে পারে না।
কমপ্লিমেন্টারি থেরাপি
ক্যান্সার চিকিৎসার যেকোন পর্যায়ে কমপ্লিমেন্টারি থেরাপি শুরু করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে মন প্রফুল্ল রাখার কৌশল, মেডিটেশন, আকুপাংচার, ম্যাসেজ, মুভমেন্ট থেরাপি। এগুলো ক্যান্সার রোগীর বিভিন্ন ধরনের একিউট ও ক্রনিক ব্যথা উপশম করে থাকে।
