কলোরেক্টাল ক্যান্সার হচ্ছে এক ধরনের ক্যান্সার যা দেহের মলাশয় বা মলদ্বারে অনিয়ন্ত্রিত কোষবৃদ্ধির কারণে সৃষ্টি হয়। এটি অন্ত্রের ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার বা রেক্টাল ক্যান্সার নামেও পরিচিত।
পরিসংখ্যান
সারা বিশ্বে যে ধরনের ক্যান্সারে মানুষ আক্রান্ত হয়, তার মধ্যে কলোরেক্টাল ক্যান্সার তৃতীয় সর্বোচ্চ দায়ী কারণ। এটি মূলত ৫০ বছর বা তদূর্ধ্বদের ক্ষেত্রে অধিক দেখা যায়। নারী ও পুরুষদের জীবদ্দশায় এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা পুরুষদের ক্ষেত্রে ২৪ জনের মধ্যে ১ জন এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৬ জনের মধ্যে ১ জনের রয়েছে।
ঝুঁকির কারণ ও লক্ষণসমূহ
একজন ব্যক্তির বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে কলোরেক্টাল ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অন্যান্য ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- অন্ত্রের প্রদাহজনিত ব্যাধি, যেমন-ক্রন’স ডিজিজ বা আলসারেটিভ কোলাইটিস
- পূর্বে নিজের বা পরিবারের কোনো সদস্যের কলোরেক্টাল ক্যান্সার বা কলোরেক্টাল পলিপ হয়ে থাকলে
- অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত কায়িক পরিশ্রম
- দৈনিক খাদ্যতালিকায় ফলমূল ও শাকসবজির অপর্যাপ্ততা
- দৈনন্দিন খাদ্যাভাসে ফাইবারের পরিমাণ কম এবং ফ্যাটের পরিমাণ অধিক থাকলে
- প্রক্রিয়াজাত মাংস অধিক আহার করলে
- স্থূলতা
- অ্যালকোহল সেবন
- তামাক সেবন
কলোরেক্টাল ক্যান্সারে আক্রান্ত অনেক রোগীদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। যখন লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে, তখন ব্যক্তিভেদে সেগুলো ক্যান্সারের আকার এবং বৃহদান্ত্রের কোথায় হয়েছে তার উপর নির্ভর করে। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মলে রক্তের উপস্থিতি, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, মল ত্যাগের পরেও মলত্যাগ সম্পন্ন হয়নি এমন অনুভূতি, পেটে ব্যথা বা ক্র্যাম্প যা মাঝে মাঝেই কষ্ট দেয়, ক্লান্তি এবং ওজন হ্রাস।
প্রতিরোধ
৪৫ বছর বয়স থেকে নিয়মিত কলোরেক্টাল ক্যান্সার স্ক্রিনিং টেস্ট করালে এই ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে অনেক সহায়ক হয়। কলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রতিরোধে যেগুলো করণীয়-
- খাদ্যতালিকায় প্রাণীজ চর্বি কম এবং ফল, শাকসবজি ও দানা শস্য বেশি থাকতে হবে
- নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম
- সঠিক ওজন
- মদ্যপান ও তামাক সেবন পরিহার করা
চিকিৎসা
ক্যান্সারের ধরন ও স্টেজ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসার সাফল্যের হার কোন স্টেজে গিয়ে ক্যান্সার সনাক্ত হয়েছে তার উপর নির্ভর করে। কলোরেক্টাল ক্যান্সারের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি হলো-
- সার্জারি
যখন ক্যান্সার শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে না পড়ে শুধুমাত্র মলাশয় বা মলদ্বারের মধ্যে আবদ্ধ থাকে তখন চিকিৎসকগণ সার্জারি করে থাকেন। এই পদ্ধতির মাধ্যমে পুরো টিউমার অপসারণ করা হয়। - রেডিওথেরাপি
সার্জারির আগে ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করতে বা টিউমারকে সংকুচিত করতে শুধুমাত্র আক্রান্ত স্থানে উচ্চমাত্রার এক্স-রে ব্যবহার করা হয়। কখনো কখনো রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপিউটিক ঔষধের কম্বিনেশন থেরাপিও ব্যবহার করা হয়। - কেমোথেরাপি
এই পদ্ধতিতে ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করতে বা টিউমারকে সঙ্কুচিত করতে কেমোড্রাগ ব্যবহার করা হয়। লিম্ফ নোডে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে সাধারণত কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয়। - কোলোস্টমি এবং ইলিওস্টমি
এগুলো কলোরেক্টাল ক্যান্সারের সার্জারির পরে করা হয় যখন মলাশয় বা মলদ্বারের কিছু অংশ অপসারণ করা হয়। এই পদ্ধতি দুটির মাধ্যমে মলাশয় বা মলদ্বারের অবশিষ্ট অংশ এবং পেটের প্রাচীরের মধ্যে একটি সংযোগস্থল তৈরি করা হয়। - টার্গেটেড চিকিৎসা
এই থেরাপিতে এমন ধরনের ঔষধ ব্যবহার করা হয় যা নির্দিষ্ট জিন এবং প্রোটিন যেগুলো ক্যান্সারের বৃদ্ধি ঘটাতে পারে সেগুলোর উপর কাজ করে। - ইমিউনোথেরাপি
ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে ক্যান্সারের ঔষধ ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ খুঁজে বের করে ধ্বংস করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
